ইসলামের জন্য দান করছেন তালেবান যোদ্ধারা

কাবুল বিজয়ী তালেবানদের ফটোশট

তালেবান যোদ্ধারা তাদের দৈনিক বেতন দশ ডলার থেকে দুই ডলার করে বায়তুল মালে জমা করবেন বলে জানিয়েছেন তালেবান মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এটিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন তালেবান সংশ্লিষ্টরা।

আফগানিস্তান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ আটকে রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ অর্থ ছেড়ে দেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন তালেবান নেতা আফগানিস্তানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আহমদ ওয়ালী হকমাল। হকমাল রয়টার্সকে বলেন, এ অর্থ আফগান জাতির। এ অর্থ আটক করা অনৈতিক এবং সকল ধরনের মূল্যবোধের পরিপন্থী। তবে ফেডারেল রিজার্ভ জানিয়েছে, এ অর্থ আফগানিস্তানের উন্নয়নের জন্য দাতা দেশ গুলো পূর্ববর্তী ঘানি সরকারের জন্য বরাদ্ধকৃত অর্থ। তালেবানের সাথে এ বিষয়ে কোন চুক্তি করা হয় নি। তবে তালেবান আলোচনার টেবিলে আসলে এ অর্থ ছাড়ার ব্যাপারে কথা বলার সুযোগ থাকবে।

আফগানিস্তানের অর্থ সংকট তালেবানদের সৃষ্ট নয়। সাবেক আশ্রাফ ঘানি সরকারের শেষের দিকেই এর শুরু। মার্কিন নিরাপত্তা বাহিনী অনেক আগে থেকেই বুঝতে পারে, তালেবানেরাই যে সরকারে বসতে যাচ্ছে এটা এক প্রকার নিশ্চিত। তাই তারা তালেবান শাসনামলকে তাদের নিয়ন্ত্রনে রাখতে চায়। শেষ তিন মাস কোন বেতন পান নি সরকারী কর্মচারীরা। কেবল ঘুষের উপরই বেঁচে ছিল সকল সরকারি কর্মচারি। মানুষের নৈতিকতাকে শেষ করে দিয়ে ভবিষ্যৎ ইসলামিক সাম্রাজ্যকে ধ্বংস করার এই প্রচেষ্টা নতুন নয়। অর্থনীতি ও মনুষ্যত্ব ধ্বংসের পর একটি জিনিস বাকি থাকে, যা হল ভ্রাতৃত্ববোধ। বিবাদমান ইসলামী দলগুলোর মধ্যে যেন সব সময় হানাহানি লেগেই থাকে তাই মার্কিনীরা তাদের সাজোয়া যান গুলো রেখে আসে আফগানিস্তানে। এর বেশীর ভাগের নিয়ন্ত্রন তালেবানদের হাতে পড়লেও অনেকাংশই পড়ে অন্য গোষ্ঠিদের কাছে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এইসব অস্ত্রে বারুদ বা বুলেটের মজুদ ফুরিয়ে যাবে। এই অস্ত্র কিনতে হবে পশ্চিমা অস্ত্র বিক্রেতাদের কাছ থেকে। নিজেদের পছন্দের মানুষদের অস্ত্র বিক্রি করবে তারা। একসাথে চলতে থাকবে পশ্চিমাদের ব্যবসা ও নিয়ন্ত্রন।

অর্থ সংকটে পড়ে বর্তমান আফগান জাতি ধীরে ধীরে দুর্ভিক্ষের দিকে ধাবিত হচ্ছে। খাদ্য সংকট চরম আকার ধারন করেছে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ঔষধের সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শুধুমাত্র খাবারের আশায়, মানুষ জন তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাব সামগ্রী বিক্রি করছে সামান্য দামে। যদিও তালেবানদের কঠোর শরীয়া আইনের কারনে দেশে চুরি ডাকাতি হ্রাস পেয়েছে। সেই সাথে বিপুল সংখ্যক মানুষ পালিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে চলে যাচ্ছে বলে অর্থনৈতিক চাপ বেশি অনুভুত হচ্ছে না।

বন্ধু রাষ্ট্র চীন তাদের প্রতিশ্রুত সাহায্য নিয়ে গড়িমসি শুরু করেছে। তালেবান নিয়ন্ত্রনের পর একটি বিশাল খাদ্য সাহায্য আশার কথা ছিল। কিন্তু তা এখনো এসে পৌছায় নি। চীন কেবল মার্কিন বাহিনী কর্তৃক নষ্ট করে দেওয়া সামরিক যান গুলো মেরামতের কাজ হাতে নিয়েছে। এক্ষেত্রে চীনের বক্তব্য স্পষ্ট। তালেবান উইঘুর মুসলিমদের নির্যাতনের ব্যাপারে মুখ না খোলার প্রতিশ্রুতি দিলেও আফগানিস্তানে বসে ইসলামিক স্টেট অফ খোরাসান উইঘুর নির্যাতনের প্রচার এবং প্রতিবাদ করে যাচ্ছে। চীন তার বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগকে হুমকির মধ্যে দেখতে চায় না। ভবিষ্যতে চীনের ধারাবাহিক সাহায্য পেতে হলে তালেবান সরকারকে আইএস সহ সকল সন্ত্রাসী গুষ্টিকে নির্মূল করতে হবে। তাই চীন খাদ্য সহযোগিতার চাইতে অস্ত্র মেরামতকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তালেবানও আফগানিস্তানের বিভিন্ন শহরে ওত পেতে থাকা আইএস সদস্যদের যেকোন মূল্যে হত্যার জন্য মরিয়া হয়ে ঊঠেছে। সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিন শতাধিক আইএস সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের মধ্যে আটজন আইএস কমান্ডার রয়েছেন। তালেবানের ভাষ্য মতে, তারা সাধারন আইএস সদস্যদের নিয়ে বিচলিত নন। এদের বেশিরভাগই দৈনিক মজুরীতে নিয়োগ প্রাপ্ত। মূল কমান্ডারদের হত্যা করতে পারলেই সমস্যা মিলিয়ে যাবে।

আইএসকে সদস্যদের ট্রেনিং ক্যাম্প

আইএস একটি স্বাধীন উইঘুরিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া আফগানিস্তান-চীন সীমান্তের বেশিরভাগ অঞ্চলেই বর্তমানে আইএস শক্ত ঘাটি গেড়ে বসেছে। তালেবানদের তুলনায় আইএস তাদের সৈনিকদের বেতন তিনগুন করেছে। বর্তমানে আইএসে সদস্য সংখ্যা কম থাকার কারনেই এটা করতে পারছে বলা ধারনা বিশ্লেষকদের। তবে এ অর্থের উৎস অনুসন্ধানে নতুন টিম গঠন করেছে তালেবানেরা। তাছাড়া যুদ্ধলব্ধ সম্পদের উপরও সৈনিকদের হক নিশ্চিত করেছে। তবুও সাধারন আফগান নাগরিকেরা বিদ্রোহী আইএসের চাইতে তালেবানদের সরকারি বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করাটাকে যৌক্তিক মনে করছে।

দেশব্যাপি চরম খাদ্য সংকটের প্রেক্ষিতে আফগানিস্তান তালেবান সরকার তাদের নিম্ন পদস্থ যোদ্ধাদের বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তালেবান যোদ্ধারা সাধারনত দুইটি ভাগে বিভক্ত। উপরের দিকে থাকেন তালেবান কমান্ডারেরা, যারা সাধারনত বিভিন্ন ধর্মীয় নেতা এবং রাজনৈতিক বিষয়ে অত্যন্ত জ্ঞানী। তারা এক একটি এলাকা নিয়ন্ত্রন করে থাকেন। যেকোন মূল্যে এলাকায় শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখাই তার প্রধান কাজ। নিজেদের প্রভাব এবং এবং অর্থ ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে তাদের দলে নিম্ন সারির যোদ্ধা থাকেন যাদের ফুট সোলজার বলা হয়। এই ফুট সোলজারেরা সাধারনত স্থানীয় কৃষক বা দিন মজুর। দৈনিক নয়শত আফগানি বা দশ ডলারের বিনিময়ে তারা তালেবানের হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহন করে থাকে। তবে যুদ্ধকালীন সময়ে এই বেতন বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। যেমন আগষ্টে কাবুল নিয়ন্ত্রনের মুহুর্তে এই বেতন বাড়িয়ে দৈনিক ষাট ডলার করা হয়।

ফুট সোলজারদের চাকরি নিয়মিত নয়। তাদের যখন ডাক পড়ে তখন তারা দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়। তবে তালেবান কমান্ডাররা রাতে বা অবসর সময়ে তাদের ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা দিয়ে থাকেন। মূলত তালেবান আদর্শ, লক্ষ্য প্রচারই মূল উদ্দেশ্য। এতে তাদের মধ্যে ইসলামের প্রতি ভালবাসা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। বেশিরভাগ ফুট সোলজারেরাই স্বেচ্ছায় বায়তুল মালে তাদের অর্থ দিচ্ছেন বলে দাবি তালেবান কমান্ডারের।

Spread the love